দেশের যেসব কওমি মাদ্রাসার নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে, যতগুলো খুঁজে পেয়েছি, ঘেটেঘুটে দেখলাম৷ পাশাপাশি মাসআলা-মাসায়েল, ফতোয়া, প্রবন্ধ সম্বলিত ইসলামি যত ওয়েবসাইট আছে, সেগুলোও দেখছিলাম৷ অনেকগুলো বিষয় চোখে পড়লো উল্লেখ করার মতো৷
পড়াশোনা, লেখালেখি, গবেষণা —সব ইলমি কাজেই কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক সবাই এখন ইন্টারনেটের সহায়তা নেয়৷ বিন্নুরী টাউন, জামিয়াতুর রশীদ, দেওবন্দ, মাকতাবাতুশ শামেলা বা বিন বাজ রহি. এর ওয়েবসাইট সহ অনেক রিসোর্স তাখাসসুসাতের ছাত্রশিক্ষকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়৷ মোটামুটি সব রেফারেন্সই দেশের বাইরের৷ তাই আধুনিক জটিল ফতোয়াগুলোতেও এসব রেফারেন্স দেখা যায়৷ কিন্তু দেশের সুনামধন্য মাদ্রাসাগুলোতে কি কাজ হচ্ছে না? এখানকার ইফতার ছাত্রদের মাসের পর ধরে গবেষণা করে তৈরি করা তামরীনগুলো কোথায়? এগুলো থেকে অন্য শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা বা অন্য মাদ্রাসার ছাত্ররা কি উপকৃত হতে পারে?
ইফতার পাশাপাশি উলুমে হাদীস বিভাগগুলোতেও কাজ হচ্ছে৷ ভালো যে দু-চারটা আদব বিভাগ আছে, সেগুলোতেও কাজ হচ্ছে৷ ছাত্রদের অনেক চেষ্টায় লিখিত প্রবন্ধ নিবন্ধ আছে৷ ভালো ভালো লেখা৷ অনেক মাদ্রাসায় ইন্ডিভিজ্যুয়াল উস্তাদগণের নেগরানিতে কিতাব বিভাগের ছাত্রদেরও ভালো কিছু লেখা তৈরি হয়৷ বিভিন্ন মাদ্রাসায় দেয়ালিকার কাজও হয়৷ মানও ভালো৷
এইযে এতো এতো কাজ, এগুলো কেনো করা হয়? কাজগুলো কোথায়? কয়জনই বা উপকৃত হতে পারে এগুলো দ্বারা? অনেক মাদ্রাসার শিক্ষকগণ লেখালেখি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক্টিভিজম করেন৷ সমসাময়িক বিষয়াদি নিয়েও ভালোই লিখেন৷ কিন্তু পোস্ট যে কয়জনের সামনে পড়ে, তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ এই লেখা৷ তাও নির্দিষ্ট সময়ের পর আর পাওয়া যায় না৷
একটা প্রতিষ্ঠান চাইলে সহজেই একটা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজেদের কাজগুলো পাবলিশ করতে পারে৷ গ্লোবালি রিচ করাও সহজ৷ অন্যদের উপকৃত করার পাশাপাশি নিজেদের ব্রান্ডিংও হয়৷ ব্যক্তিপর্যায়ে একটা ওয়েবসাইট পাবলিশ করে সেটার খরচ বহন ও নিয়মিত নতুন কনটেন্ট পাবলিশ — অনেকটা কঠিন৷ অন্যদিকে একটা প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা আহামরি কিছু না৷ ছাত্ররা নিজেদের লিখিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ফতোয়া নিজেরাই পাবলিশ করার সুযোগ পেলে তাদের আগ্রহ বাড়বে, টাইপিং চালু হবে, বেসিক কম্পিউটার শেখা হবে৷ সর্বোপরি দেশব্যাপী অনেকেই উপকৃত হবে৷ নিজ প্রতিষ্ঠানের ব্রান্ডিংও হবে৷ অথচ অধিকাংশ বড়সড় মাদ্রাসাগুলোর ওয়েবসাইটই নাই৷ যেগুলো আছে সেগুলোও কিছু ৫/৭ বছর আগে যেভাবে ছিলো সেভাবেই পড়ে আছে৷ কিছু ডোমেইন এক্সপায়ার হয়ে আছে, খবরও নাই৷ ছোটখাটো মাদ্রাসার অবস্থা তো বাদই দিলাম৷
হুজুরদের আধুনিক ও স্মার্ট হওয়া বলতে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়া এক্টিভিটি বুঝে৷ ফেইসবুকে সময়, মেধা, শ্রম, ফোকাস —সব নষ্ট করে নাকি দিনদিন আধুনিক হচ্ছে৷ বাস্তবতা হচ্ছে ইলমি মানুষজনের সোশ্যাল মিডিয়া এক্টিভিজম একদমই বন্ধ করা উচিত৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় ৫% সময় প্রোডাক্টিভ হলেও বাকি ৯৫% সময় পুরোপুরি নষ্ট হয়৷ এছাড়া ফোকাস নষ্ট হওয়া, ক্রমান্বয়ে প্রোডাক্টিভিটি হ্রাস পাওয়া তো আছেই৷ দিনশেষে যে কাজগুলো হওয়া দরকার, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদি ফলপ্রসূ, সেগুলো কিন্তু হচ্ছে না৷ সর্বোপরি ইলম চর্চা যতটুকু হচ্ছে তার ৫%ও সংরক্ষণ হচ্ছে না৷ অন্যরাও উপকৃত হওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ এটা অত্যান্ত দুঃখজনক৷ পৃথিবীর সবকিছুই এখন গুগল করে পাওয়া যায়৷ একদম সব৷ সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম বিষয়ও৷ পাওয়া যায় না কেবল দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে কি হচ্ছে না-হচ্ছে সেসব৷
