শিক্ষাদিক্ষা2 min read

পেশাগত বৈচিত্রের অভাব ও মেধায় অপচয়

পেশাগত বৈচিত্রের অভাব ও মেধায় অপচয়

এখন প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী হাই’আতুল উলয়া পরীক্ষা দেয়। এই বিশাল সংখ্যার কত শতাংশ ফারাগতের পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিচ্ছে? গত ৫/৬ বছরে যারা ফারেগ হয়েছে, সার্ভে করলে দেখা যাবে—সব মিলিয়ে ১০%ও এমন শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না, যারা ভবিষ্যতে সবকিছু ছেড়ে কেবল শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভেবেছে। কারণ আর্থিক বাস্তবতা এখন অনেক জটিল। সবাই জানে—কওমি মাদ্রাসার বাস্তবতায় কেবল শিক্ষকতা নিয়ে থাকলে আর্থিকভাবে জীবন জটিল হয়ে পড়বে, পারিবারিক জীবন কঠিন হয়ে যাবে। মাদ্রাসায় যে বেতন দেওয়া হয়, একসময় সেটা আমাদের সমাজের নিম্ন-মধ্যবিত্তের ক্যাটাগরিতে পড়তো; আর্থিক জীবন তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় সেটা আর নিম্ন-মধ্যবিত্তের কাতারেও পড়ে না।

এই অস্থিরতা থেকেই শিক্ষকতাকে মূল পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবছে না এখনকার ফারেগীনরা। যারা ভাবছে তারাও ইমামত, খেতাবত বা টুকটাক ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষকতার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষকদের মূল ফোকাস আর ছাত্রদের প্রতি থাকে না। মসজিদ, ওয়াজ-মাহফিল বা ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থেকে ছাত্রদের আগলে রেখে মানুষ করে তোলার সেই সময়, আগ্রহ বা সদিচ্ছা—কিছুই আর থাকে না। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকতা কখনও শুধু কিতাব পড়ানোকে বোঝায় না। এখানে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক অন্য সবার চেয়ে মহান। তাই শুধু পড়িয়ে দিলে দায়িত্ব আদায় হয় না। ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য বিস্তৃত মুতালাআ ও পড়াশোনা লাগে। ছাত্রদের সময় দিতে হয়। এসব ছাড়া কেউ আদর্শ শিক্ষক হতে পারে না। আর এসব তখনই সম্ভব, যখন মূল ফোকাস থাকে শিক্ষকতার প্রতি।

তাছাড়া প্রতিবছর ৩০ হাজার মানুষ সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে একটি পেশা গ্রহণ করবে—এটাও অবাস্তব। বাধ্য হয়ে গ্রহণ করলেও সবাই এখানে সফল হবে না। পেশাগত বৈচিত্র্য যত কম, মেধার তত অপচয়। সবাই এক ফিল্ডে ভালো করবে না। যোগ্য ব্যক্তিকে তার স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রথম চেষ্টাটা করবে শিক্ষাব্যবস্থা—সেখানেই ব্যর্থ আমাদের কর্তৃপক্ষ। কওমি মাদ্রাসার প্রাথমিক শিক্ষা পৃথিবীর যেকোনো ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে বহুগুণ ভালো। এখানকার ছাত্রদের ভিত্তি অনেক বেশি মজবুত। তা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের অবহেলার সীমা নেই এই মেধার প্রতি। কর্তৃপক্ষ না পারছে এই মেধাগুলোকে দেশের বাইরে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে, না পারছে কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতি করতে। বরং এখনো আমরা দেশের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে পড়ে আছি। চৌহদ্দির বাইরে গেলে বুঝা যায়—কীভাবে ‘অশিক্ষিত’ হিসেবে ট্রিট করা হয়। ১৪/১৫ বছর অন্য যেকোনো শিক্ষিত নাগরিকের চেয়েও ডিসিপ্লিনের সাথে পড়াশোনা করার পর যখন আপনি সরকারি অফিসে যাবেন, সেখানে ‘অশিক্ষিত’ হিসেবে ট্রিট করা হলে সেই অনুভূতিটা আমাদের মুরুব্বিরা অনুধাবন করেন না। আবুল মনসুর আহমদের আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইতে পড়েছিলাম—ইংরেজ আমলে হিন্দু জমিদারদের দরবারে মুসলমানদের সাথে এমন আচরণ করা হতো। স্বাধীনতার ৭০ বছর পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের নাগরিক হয়ে একই অবস্থায় পড়ে আছি। গর্তের ভেতর থেকে বের হয়ে যেদিন চারদিকে তাকাবেন—সেদিন বুঝবেন এই অনুভূতি।

সর্বোপরি

শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণ, দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতার মান উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়েই কর্তৃপক্ষকে মনোযোগ দিতে হবে। যদি সদিচ্ছা থাকে আরকি।

Share this article: